সর্বশেষ
Home / মুক্তমত / ৪৬ বছরেও হয়নি স্মৃতি ফলক : হারিয়ে যাচ্ছে হারুন-অর-রশিদ বীর প্রতীকের কবর

৪৬ বছরেও হয়নি স্মৃতি ফলক : হারিয়ে যাচ্ছে হারুন-অর-রশিদ বীর প্রতীকের কবর

unnamedমোঃ শামীম হোসেন মিজি : বাঙ্গালীর মহান বিজয় ৪৫ বছর পেরিয়ে আজ ৪৬ বছরে পা রেখেছে। কিন্তু যাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই বিজয় তাদের অনেকেই রয়ে গেছেন স্মৃতির আড়ালে । তাদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশীদ বীর প্রতিক। যার রক্তে আমাদের বিজয় লেখা । তিনিই রয়ে গেছেন স্মৃতির অন্তরালে। আসুন পাঠক আজ দেখে নেওয়া যাক জাতির এই শ্রেষ্ট সন্তানের কীর্তিগুলো-
আগুন ঝরা ১৯৭১। বাঙ্গালী তার স্বাধীকার পেতে ৭০ সালে ম্যান্ডেড দেয় আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দলকে। নৌকার সেই বিজয় গাথা মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তানী জালেম শাহীরা। তাইতো ৭১ এর ২৫ মার্চ ঘুমন্ত বাঙ্গালীর উপর চালালো ইতিহাসের নজিরবীহিন হত্যাকান্ড। খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়লো বাঙ্গালীর স্বপ্ন সাধ। কিন্তু সহজেই কি সব ভেঙ্গে ফেলা যায়? তাই প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠলে বাংলার জমিনে। দেশমাতৃকার সেই আহবানে নিজের জীবন বাজী রেখে বাংলার হাজারো দামাল ছেলের দল। এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ট সময় এ ডাক গিয়ে পৌছে যায় হারুনের কানে। তখন তিনি তেইশ বছরের টগবগে তরুন। হয়ে যান ইতিহাসের অঙ্গ। মাত্র ৪২৬ জনের একজন এই হারুনকে নিয়ে আমাদের আজকের উপাখ্যান।
১৯৪৮ সালে চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার (সে দিনের থানা) বেগমপুর ইউনিয়নের একটি অতি সাধারণ গ্রাম রাঙ্গিয়ার পোতা। সীমান্তের সাথে বসবাস। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন হারুন অর রশীদ। বাবার নাম আহমদ আলী আর স্বর্ণগর্র্ভা মায়ের নাম বিরাজ খাতুন। পড়াশুনার পাশাপাশি বাবার ছেট্ট কারবারে সহযোগিতা করতেন। তবে প্রতিবাদী ছিলেন। যে কোন অন্যায় দেখলেই  প্রতিবাদ করতেন। এলাকা বাসী বলত এই ছেলে একদিন ঠিকই নাম কিনবে। তারুন্যের শুরুই হয় রাজনীতি দিয়ে। এরপর যৌবনে এসে তিনি নাম লেখালেন স্বাধীনতা সংগ্রামীর বড় মলাটেভরা দামী খাতায়। হয়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা। হানাদার দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীকে হটিয়ে লাল সবুজের পতাকা উড়াতে সেদিন তিনি ঘর ছাড়লেন। বয়স সেই তেইশ। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েই প্রশিক্ষন নিতে পাড়ি জমান ভারতে। প্রশিক্ষন শেষে তার ঠাঁই হয় ৮ নম্বর সেক্টরে। নিয়োগ পান সাব সেক্টর কমান্ডার হিসাবে। তার নেতৃত্বে যদুপুর ক্যাম্প আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
আগস্ট মাসে এ অভিযানে হারুনুর রশীদ নেতৃত্বে সবাই বাংলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। শুরু হয় রেকি করা। কোনভাবেই ঠিক করা যাচ্ছিলনা আক্রমণের সময়। এটা ছিল এলাকয় শত্রুদের সবচেয়ে সুরক্ষিত ঘাটি। সারা দিনরাত এখানে পাকিস্তানিরা নজর রাখত। কে আসে আর কারা যায় তার খোজ করে সন্দেহ হলেই গুলি চালিয়ে হত্যা করতে দিদ্ধা করত না। এই ধরনের সুরক্ষিত ঘাটি আক্রমণ স্বল্প প্রশিক্ষিতদের জন্য চরম ঝুকিপূর্ণ। তারপরেও দেশমাতৃকার প্রেমে উদ্বুদ্ধ মুক্তিবাহিনীর দামাল ছেলের দল ঠিকই আক্রমণ করে বসল এই ঘাটি। সেদিনটি ছিল ২৭ নভেম্বর। হারুনুর রশীদ যদুপুর ক্যাম্পে তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে আক্রমণ চালান। সহযোদ্ধারাও সংকেতের অপেক্ষা না করে গুলি শুরু করলে সঙ্গীদের নিয়ে তিনি ক্রস ফায়ারে পড়েন। তাদের মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যায় অগণিত গুরি। অনেক কষ্টে তারা ক্যাম্পের ভেতর থেকে বের হতে সক্ষম হন। পরে দ্বিতীয় দফায় তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালান। ঐ দিনে হারুনুর রশীদের গোলায় ৪ জন পাকিস্তানি সেনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়।
কিন্তু একটি বুলেট বিদ্ধ হয় হারুন-অর-রশিদের শরীরে। তখনও মুক্তির নেশায় পাগল হারুনের শ্বাস ছিল। সহযোদ্ধারা আহত হারুনকে সাথে করে পিছু হটলেন। কিন্তু তাকে বাচাঁনো গেলনা। এই অপারেমনের পরে তার বীরত্বের কারনে তিনি বীর প্রতিক উপাধিতে ভূষিত হন। পর দিন বাদ জোহর তাকে চুয়াডাঙ্গা সদরের এই বেগমপুর ইউনিয়নের যদুপুর গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
কিন্তু অবহেলায় তাদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগ হারিয়ে যেতে বসেছে । দুঃখের বিষয় একজন রাষ্ট্রীয় খেতাবপাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এলাকায় রয়েছেন এটি বর্তমান প্রজন্ম জানেনা। এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধারাও ভূলে গেছেন। বেগমপুর ইউনিয়নের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়ুব আলী ও গুটি কয়েক জন ছাড়া কেউ কবরটি চেনেন না ! এদের মৃত্যুর পরে হয়ত এই বীরের কবরটি হয়ে উঠবে গোচারণভূমি অথবা কারো বসত বাড়ি কিম্বা চাষের ক্ষেত।
তবে আশার কথা বাঁশ বাগানে গন-কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধা আয়ুব আলীকে নিয়ে লেখক-প্রতিবেদক এবং এলাকাবাসী ২০১০ সালে মাটি দিয়ে অন্য কবর থেকে এই কবরটি সামান্য উচু করে দেন। চিহিৃত করে রাখার জন্য এটি করা হয়। তারপরেও বর্ষার পানিতে ছয়লাব হয়ে যাওয়া সে চিহৃ হারিয়ে গেছে। আবার নিশানা হিসাবে যে গাছটি তক্কের মত কবরটি পাহারা দিত সেটিও কেটে ফেলা হয়েছে।
জাতি আজ ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর উৎযাপন করে। এজন্য স্কুল গুলোতে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্মরণ করা হয় বীরদের। এসব অনুষ্ঠানে হাজার প্রবীণ-নবীন উপস্থিত থাকেন, তাঁদের চোখে কিন্তু এই অবহেলা আর বঞ্চনার কোন কথা বের হয়ে আসে না। ৭১-এ হারানো স্বজনদের মুখায়ব কখনও তাদের দেহ মনকে ভরাক্রান্ত করেনা। তবে কিছু তরুনদের প্রানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং বীরদের আত্মত্যাগের কাহিনী জাগরুক বলেই আজ এই সমাধিটির প্রতি সকলের দৃষ্টি পড়েেেছ।
তাই সমগ্র এলাকাবাসী অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বীরপ্রতীকের কবরকে স্মৃতিসৌদে পরিণত করার জন্য বর্তমান সরকারের কাছে জোর দাবী জানিয়েছে। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা ১ সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা হুইপ সোলাইমান হক জোয়ার্দ্দারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
এখানে স্মৃতিস্তম্ভ হলে এলাকাবাসী এবং তাদের আগামী প্রজন্ম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় বীরদের বীরত্বগাথা জানতে পারবে। একই সাথে রাজাকারদের কর্মকা- বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারনা জন্মাবে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় নিশ্চয়ই এই বীরের স্মৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসবেন।

_MG_6730

লেখক : সাধারণ সম্পাদক

ডুসাক ,শিক্ষার্থী ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

আন্দুলবাড়ীয়ায় নব-নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান-মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এলাকাবাসীর ভালোবাসা ও ফুলের শুভেচ্ছায় সিক্ত

আন্দুলবাড়ীয়া প্রতিনিধি: সদ্য অনুষ্ঠিত তৃতীয় ধাপে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচনত্তোর জীবননগর উপজেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *