সর্বশেষ
Home / শিল্প সাহিত্য / প্রবন্ধ / শিক্ষাক্ষেত্রে কতিপয় গুরুতর সমস্যা ও কিছু সুপারিশ

শিক্ষাক্ষেত্রে কতিপয় গুরুতর সমস্যা ও কিছু সুপারিশ

boon-lay-22222-sg boon-sg-tif

এম, শওকত আলী
বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান একাধিক সমস্যা নিয়ে বহু এ্যাকাডেমিক আলোচনা হয়েছে ও হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার সার্বিক মানের গুরুতর অধোঃগতির বিষয়টি একটি জাতীয় সমস্যায় পরিনত হয়েছে। এই বিষয় নিয়ে তাত্বিক দিক থেকে যেসব আলোচনা হয়েছে তা যাদেরকে নিয়ে তারা তার কতটুকু বুঝতে পেরেছে বা তার থেকে শিক্ষা নিয়েছে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ বটে। তাই সাদা কথায় কিছু বিষয় সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ একটি  পর্যালোচনা করলে যা পাওয়া যায় তাকে শিক্ষক ও শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রম, ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি ও শিক্ষানীতি – এই ক্রমানুসারে  নি¤œবর্নিতভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
শিক্ষক নিয়োগঃ
একসময় ছিল যখন জমিদার, ভ’স্বামীদের ছেলেরা মনের টানে শিক্ষকতায় আসতেন। তারা এটাকে পেশা হিসেবে নিতে জানতেন না। এটা ছিল তাদের নেশা। টাকাপয়সার প্রতি তাদের টান ছিলনা কারন তারা স্বচ্ছ্বল ছিলেন। এ ধারা এমনকি স্বাধীনতাপুর্ব কালেও অনেকটাই বজায় ছিল। যদিও ততদিনে অনেক অস্বচ্ছ্বল ব্যক্তিও শিক্ষকতা পেশায় আসতে শুরু করেছিলেন। তখন তারা কেবল বিদ্যালয় প্রদত্ত সামান্য বেতনেও সন্তুষ্ট ছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকতা শুরু করেছিলাম মাসিক মাত্র আশি টাকা বেতনে, সেই ১৯৬৫ সালে।
শিক্ষকতা পেশায় যে নিষ্ঠা, একাগ্রতা, ঐকান্তিকতা ও দক্ষতা অত্যাবশ্যকীয় তার অবক্ষয় শুরু হ’ল যখন থেকে শিক্ষকদের বেতনের নির্দিষ্ট অংশ সরকার দেওয়া শুরু করল। অপ্রিয় হলেও সত্য যে তখন থেকে অনেকেই শিক্ষকতাকে চাকুরী বলে ভাবতে শুরু করলেন। আমরা জেনেছিলাম শিক্ষকরা ’এমপ্লয়ারও নন, ’এমপ্লয়িও’ নন। শিক্ষকদের বেতনস্বল্পতা তাদের কর্মদক্ষতাকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করত ঠিকই; কিন্তু বেতনের তিন-চতুর্থাংশ সাবভেনশন দেওয়া শুরু হলে শিক্ষকতা আর ’শিক্ষকতা’ থাকল না; চাকুরী হয়ে গেল। আর আজ তো শিক্ষকেরা পুরোপুরি চাকুরে। তাদের কাছে আর সেই নিষ্ঠা, ঐকান্তিকতা, নিবেদিতপ্রানতা ও দক্ষতার আশা করা যায় না। এই পেশার অবক্ষয় পুরোপুরি শুরু হ’ল যখন গত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হ’ল। (এর ভবিষ্যত চরম কুফল সম্পর্কে আমার একটি লেখা বিগত ৪/৮/২০০২ইং সালে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।) এখান থেকে শিক্ষকতায় নিয়োগ একদিকে একটি বিনাপুঁজির বিরাট লাভজনক ব্যবসায়ে পরিনত হ’ল, অন্যদিকে দলীয় কর্মী-সমর্থক পোষার এক গুরুত্বপুর্ন মাধ্যমে রুপ নিল। এখন আর একনিষ্ঠতা, নিবেদিতপ্রানতা, দক্ষতা ও যোগ্যতা মুখ্য থাকল না; টাকা/ঘুষ দেবার ক্ষমতা বা দলীয় কর্মসুচীতে সক্রিয় অংশগ্রহন আরো গুরুত্বপুর্ন হয়ে পড়ল। আর যখন টাকা দিয়ে শিক্ষকতা কেনা যায় বা দলীয় পরিচয় যখন সকল অযোগ্যতা ও অসততাকে ছাপিয়ে ওঠে তখন আর ভয় কিসের? আজ শিক্ষকদের সিংহভাগ আর নিজের মনমগজ থেকে কোন কিছু বের করে শিক্ষার্থীদেরকে দেবার কথা ভাবতে পারেন না। নোট-গাইড বই-ই তাদের মুলধন। এদের কাছে ছাত্র-ছাত্রীরা কি শিখবে? তাদের ভেতরকার সৃজনশীলতার পরিস্ফুটন কিভাবে ঘটবে? একটি উদাহরন দিলেই ব্যাপারটা সহজে বোঝা যাবে। বর্তমানে ইংরেজী শিক্ষন-শিখনে যে চারটি স্কিল দরকার তা হ’ল লিসনিং, স্পিকিং, রিডিং ও রাইটিং। এখন শিক্ষার্থীরা ’লিসন’ করবে কার কাছ থেকে, কিভাবে? সেটার জন্য অবশ্যই শিক্ষককে স্পিকিং-এ দক্ষ হতে হবে। কিন্তু আমাদের কয়জন ইংরেজী শিক্ষক ঐ কাজে দক্ষ ও যোগ্য? একই অবস্থা অন্য অনেক বিষয়েও। যে শিক্ষক নিজেই পাঠের বিষয়বস্তু বোঝেন না তিনি কিভাবে শিক্ষার্থীদেরকে শেখাবেন? যার নিজের মধ্যেই সৃজনশীলতা নেই তিনি কিভাবে তার শিক্ষার্থীদেরকে সৃজনশীল করে তুলবেন? জ্ঞানীরা বলেন, ’শিক্ষক জন্মান, তাকে তৈরী করা যায় না।’ এজন্যই শিক্ষকতা ও কেরানীগিরি/অফিসারগিরির মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। শিক্ষকদেরকে বাঁধা পথে চললে চলে না; তাকে তার পথ তৈরী করে নিতে হয়। তাকে ’ইনোভেটিভ’ হতে হয়।
ভাল শিক্ষক অত্যাবশ্যক ভাল জাতি গঠনের জন্য। বলা হয়ে থাকে শিক্ষকরাই জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু আজ শিক্ষাব্যবস্থার যে চরম ক্রমাবনতিশীল অবস্থা তাতে কি শিক্ষকদেরকে জাতির মেরুদন্ড বলার সে সুযোগ আছে? চারিদিকে নকলের মহোৎসব। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মচ্ছব। রাজনীতির ঘোলাজলে শিক্ষকতার নাকানি-চুবুনি। নিজ পদ বজায় রাখার জন্য যোগ্যতা ও দক্ষতা নয়, দলবাজি ও নিযোগকর্তাদের পদলেহন। এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও এই নিকৃষ্ট কর্মে ব্যবহার। নৈতিকতার অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই কেবল নন, প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এক শ্রেনীর শিক্ষক এমনকি তাদের কন্যা বা নাতনীসম শিক্ষার্থীদেরকেও যৌননিপীড়নের শিকার বানাতে বিন্দুমাত্র বিবেকদংশনে ভুগছেন না। আর এই অবস্থা যে রাতারাতি হয়নি সেটা কে না জানে। প্রাথমিক স্তরে শিশুদের মনমানস গঠিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সাথে তারা নীতি-নৈতিকতা শেখে, তাদের মধ্যে মুল্যবোধ জাগ্রত হয়। মাধ্যমিক স্তরে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে তাদের চরিত্রও গঠিত হয়। বস্তুতঃ মাধ্যমিক স্তরটিই শিক্ষার মেরুদন্ড। এই স্তরে তার সমগ ভবিষ্যত্র জীবনের ভিত্তি গঠিত হয়। এই শিক্ষার্থীরাই আগামী কাল দেশের নেতা, পরিচালক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যাংকার, কূটনীতিক ইত্যাদিরূপে দায়িত্ব ও কর্মসম্পাদন করে দেশকে উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু উপরে বর্নিত শিক্ষকদের কাছ থেকে তারা কি শিখবে, কি পাবে? ভবিষ্যতে তারা কি ভ’মিকা পালন করবে?
এই চরম হতাশাজনক অবস্থা থেকে বেরুবার জন্য তাই সবচেয়ে আগে দরকার শিক্ষাকে রাজনীতিমুক্ত করা। রাজনীতিকে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে ’গো-হত্যাসম পাপ’ বলে সরকার ও জনগনকে স্থির করতে হবে। এর পর শিক্ষকতা পেশায় যারা আসতে চান তাদের মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর পর তাদের প্রশিক্ষন দিতে হবে এবং সেটা ২/৪ সপ্তাহ বা ২/৪ মাসের নয়। অন্ততঃ পুরো এক বছর এই প্রশিক্ষন চলা দরকার। এজন্য সরকারকে শিক্ষক প্রশিক্ষনকে ১নং প্রায়রিটি দিতে হবে। এজন্য উপযুক্ত পরিমান বাজেট বরাদ্দ অবশ্যই রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগই শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। এর উপরে একটি জাতির ভবিষ্যত নির্ভর করে। যে সরকার এটা করতে ব্যর্থ হবে সে সরকার কখনোই দেশকে ভাল কিছু দিতে পারবে না।
শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমঃ
শিক্ষাক্রম বিষয়ে খুব বেশী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নেই বলে সে বিষয়ে বেশী কিছু বলব না। তবে সুদীর্ঘ শিক্ষকতাজীবনে লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে গেলে বলতে হয় যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যক্রমের বর্তমান যে অবস্থা তাকে খুব কার্যকর ও আশাপ্রদ বলা যায় না। বিশদ আলোচনায় না গিয়ে সে সম্পর্কে এটুকুই বলা যায় যে বাস্তবতা ও কার্যকারিতার নিরিখে তার ’ভলিউম’ অনাবশ্যকভাবে বৃহৎ। পাঠ্যক্রমকে প্রকৃতই আনন্দদায়ক, কার্যকর ও ফলপ্রসু করতে বর্তমান শিক্ষাক্রমিক স্তরগুলিতে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা) বিষয় ও পাঠ্যক্রমকে পুনর্বিন্যাস করার দরকার। প্রাথমিক শিক্ষায় যে পাঠ্যক্রম আছে তা কোন দর্শনের ওপর নির্ভর করে করা হয়েছে তা বোঝা মুশকিল। বর্তমানে শিক্ষক প্রশিক্ষনে রুশো, ফ্রোযেবেল, ডিউই ইত্যাদির চিন্তাভাবনার কথা বলা হয়। রুশো বলেছেন, ’শিশুরা শিখবে আনন্দের মধ্যে।’ এই ’আনন্দের মধ্যে’ শিখতে হলে কি তার ওপর ১০/১২টা বই-পুস্তকের ভার চাপাতে হবে? এর সঙ্গে তার দ্বিগুনসংখ্যক খাতাপত্র? বর্তমানে একটি কেজি শ্রেনীর বাচ্চার কাঁধেও অন্ততঃ ৫/৬ কেজি ওজনের ব্যাগ থাকে। এ বিষয়ে আমি একবার শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে আমার শিক্ষক প্রয়াত প্রফেসর শামসুল হক-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি কেবল হেসেছিলেন; উত্তর দেন নি। সম্ভবতঃ উত্তর দেবার কিছু ছিলও না। যাহোক, এখন এই এত্তবড় একটা বোঝা রোজ রোজ বইবার পরে তার মধ্যে আনন্দ বলতে আর কি থাকতে পারে? তাই শিশুদেরকে সত্যিকারের আনন্দের মধ্যে কিছু শেখাতে হলে পাঠ্যপুস্তক ও খাতাপত্রের এই বিরাট বোঝা অবশ্যই কমাতে হবে। আশার কথা যে মহামান্য হাইকোর্ট এই বিষয়ে নাকি একটি আদেশ দিয়েছেন যে শিশুর ওজনের ১০%-এর বেশী বোঝা তাদের ওপর চাপানো যাবে না। অবশ্য একথা সংশ্লিষ্টরা মান্য করলেই হয়। তবে বিষয়টির সমাধান খুব কঠিন কিছু নয়। প্রি-প্রাইমারীতে কেবল আঁকিবুকি, খেলা ও অক্ষরজ্ঞানই যথেষ্ঠ হওয়া উচিত। ১ম থেকে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত নীচের তালিকা অনুযায়ী বিষয়গুলি পড়াতে হবে।

শ্রেনী    বিষয়

১ম, ২য়           বাংলা     অংক    ইংরেজী    –    –    –    –
৩য়                   ঐ          ঐ          ঐ         ধর্ম     পরিবেশ    সাধাঃ জ্ঞান    –
৪র্থ-৫ম           ঐ           ঐ          ঐ          ঐ         ঐ         সমাজবিদ্যা    –
৬ষ্ঠ-৮ম          ঐ            ঐ         ঐ           ঐ         ঐ             ঐ    স্বাস্থ্যবিজ্ঞান

এই বিষয়গুলি ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গঠন করবে। শিক্ষার্থীদের ওপর অনাবশ্যক ভার চাপালে শিক্ষক ও পুস্তকব্যবসায়ীদের লাভ হতে পারে; তবে শিক্ষার্থীদের লাভ যে বেশী হবেনা তা আমার প্রায় ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। উদাহরন হিসেবে বলা যায়, ইংরেজী এখন কেজি শ্রেনী থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেনী অবধি পড়ানো হয়। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের কাছে ফ্রি-স্টুডেন্টশিপের দরখাস্তটি ২য়-৩য় শ্রেনী থেকে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত শেখানো হয়। যদি এরকম একটি সাধারন দরখাস্ত লেখা শেখার জন্য ১০/১২ বছর লেগে যায় তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা কি ইংরেজী শিখছে তা একজন রাখালও বোধহয় বলতে পারবে। আরো মজার একটি উদাহরন বেশ কিছুদিন আগে দেশের সর্বোচ্চপদের এক আমলা দিয়েছিলেন। ঘটনাটি এরকম। স্মৃতি থেকে বলছি। একবার বিদেশী এক ডেলিগেশন এদেশে আসল। তার নেতৃত্বে ছিলেন একজন মহিলা। তাদের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন আমাদের যুগ্ম-সচিব পদের একজন কর্মকর্তা। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে যুগ্ম-সচিব মহোদয় ঐ মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’হাউ ইজ ইয়োর বডি?’ ভদ্রমহিলা নাকি দারুনভাবে ’এমব্যারাস্ড্’ হয়েছিলেন। কিন্তু কেন? কেন ঐ ’এমব্যারাসিং সিচুয়েশনের’ সৃষ্টি হ’লো? কারন বক্তা ঐরকমভাবেই ইংরেজী শিখেছিলেন হয়ত বা। বাংলায় তো আমরা হরহামেশাই পরিচিত বন্ধুবান্ধবকে বলি ’ভাই/বোন, আপনার শরীর কেমন?’ কিন্তু একটি ভাষার সঙ্গে সে দেশের কালচারও জড়িত থাকে। সে কারনে ভাষা শেখার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কালচার সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারনা নিতে হয়। সেজন্যই ১০/১২ বছর ইংরেজী পড়লেই যে ইংরেজী ’শেখা’ যায় না তা তো বুঝতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেটা বোঝার মত শিক্ষক আমাদের মধ্যে দুর্লভ।
৯ম ও ১০ম শ্রেনীতে ইংরেজী ও বাংলার সাথে মানবিক, ব্যবসায় বা বিজ্ঞানের যে কোন শাখায় সর্বাধিক তিনটি ইলেক্টিভ এবং একটি ৪র্থ বিষয় থাকতে পারে। তবে অতি অনাবশ্যকতার কারনে মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগে সাধারন বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান বিভাগে সামাজিক বিজ্ঞানকে অবশ্যই বাদ দিতে হবে। এর কারন মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিভাগে তো ভর্তিই হতে পারবে না। তাদের প্রোটোপ্লাজম, মাইটোকন্ড্রিয়া ইত্যাদির জ্ঞান কি কাজে লাগবে? তেমনি মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শ্রেনীতে বা চাকরী জীবনে পদার্থ, রসায়ন বা জীববিদ্যাকে কোন কাজে লাগাবে? এটা কি তাদের ওপর নিতান্তই জুলুম নয়? এই অনাবশ্যক বিষয়গুলি পুস্তক লেখক ও প্রকাশকদের জন্য লাভজনক হতে পারে; তবে শিক্ষার্থীদের জন্য যে নয় সেটা অনস্বীকার্য। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমের বিষয়ে উপরোল্লিখিত আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে এর যৌক্তিকতা খুঁজে পেতে আশা করি দেরী হবে না।
উচ্চশিক্ষার বিষয়ে বলা যায় যে অকারনে প্রাজুয়েশন পর্যায়ের শিক্ষাকে দীর্ঘায়িত না করে এসএসসি-র পর চার বছরের ডিগ্রী কোর্স এবং এক বছরের মাস্টার্স কোর্স সমাপ্তির কথা ভাবতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার কোন প্রয়োজন আছে কি না সেটা গবেষনার বিষয়। তবে মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রী কোর্স পাঁচ বছরের করা দরকার আছে। ডিগ্রী পর্য়ায়ে প্রথম বর্ষ থেকেই মেজর সাবজেক্ট ঠিক করে উন্নত দেশগুলোর মত শিক্ষাক্রম চালু করা আবশ্যক। শিক্ষাজীবনকে অনাবশ্যকভাবে দীর্ঘায়িত করা আদৌ কাম্য হতে পারে না।
ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি (এসএমসি/জিবি)ঃ
শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও তার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি ও রক্ষা করার ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির গুরুত্ব অপরিসীম। এই কমিটি একটি স্কুল/কলেজকে সুন্দর ও সার্থক একটি পরিবেশ দিতেও পারে আবার তাকে ধ্বংসও করতে পারে। বর্তমানে এই এসএমসি/জিবি শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই ’কমলবনে হস্তী’-র রুপ নিয়েছে। হয়ত ১০০% নয় তবে ৮০%-এর কম ক্ষেত্রে নয়। শিক্ষার মানের আশংকাজনক ক্রমাবনতির জন্য এই ’বডি’র দায়িত্ব কম নয় মোটেই। এর কারন প্রায় পুরোটাই রাজনৈতিক। গত বিএনপি-জামাত শাসনামলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এই ’বডি’-গুলির চেয়ারম্যান করার ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে তছনছ করে ফেলা হয়েছে। এর আগে ঐ ’বডি’র নানা রকম উপদ্রব থাকলেও তা অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। তখন জেলা প্রশাসকগন দায়িত্বে থাকায় পরিস্থিতির এতটা অবনতি হতে পারে নি কারন তখন এর মধ্যে এত নগ্নভাবে রাজনীতি ঢুকতে পারেনি। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করার ফলে বর্তমানে টাকার বিনিময়ে বা রাজনৈতিক পরিচয়ে অসংখ্য অযোগ্য, অদক্ষ ও সুবিধাবাদী নীতিহীন লোককে শিক্ষকতায় ঢোকানো হয়েছে। এছাড়া নিজেদের সুবিধা ও স্বার্থের জন্য প্রধান শিক্ষকসহ অপছন্দের শিক্ষকদেরকে – সে শিক্ষক যতই যোগ্য, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রান হোক না কেন – স্কুল কলেজ থেকে তাড়ানোর মত চরম অন্যায় কাজও অবলীলায় করে থাকেন। এমনিতেই প্রধান শিক্ষককে ৮/৯টি অথরিটির কাছে জবাবদিহি করতে হয়। তার ওপর এই সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা অধিকাংশ সময় নিয়ম বহির্ভুতভাবে প্রধানশিক্ষককে নানা রকম চাপের মধ্যে রাখেন। পান থেকে চুন খসলেই নানাভাবে অপমান অপদস্তের শিকার হতে হয়। এসএমসি/জিবি-র কার্যপরিধির বাইরে গিয়ে তারা এগুলো করেন। তাদের কথা হচ্ছে তারাই স্কুল/কলেজের মা-বাপ। সরকারী আইন বিধি তাদের জন্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে এসএসসি পাশ করতে পারেনি যে ছাত্র তাকেই ঐ স্কুলের এসএমসি-র চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে আর সে তারই প্রধান শিক্ষককে হুকুম দিচ্ছে এটা করুন, ওটা করুন। এটা যে ঐ প্রধানশিক্ষকের জন্য কতটা মর্মপীড়াদায়ক সেটা কি কেউ কখনো ভেবেছেন? আর এইসব ব্যক্তিত্বরা রাজনৈতিক বিধায় সরকারও এদেরকে নিয়মের মধ্যে কাজকর্ম করতে বলে না। এরা নিয়ম ও বিধিবহির্ভুতভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে প্রতিবন্ধকতাকারী কত প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষকে এমনকি চরম স্বেচ্ছাচারমুলকভাবে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করেছে তার পরিসংখ্যানও নেহাত কম হবে না। এভাবে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির পুরো প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থাপনা আর প্রতিষ্ঠানপ্রধানের হাতে নেই। ফল যা হবার তাই হয়েছে ও হচ্ছে। পতিষ্ঠানপ্র্রধানকে যদি সার্বক্ষনিক তার পদ ঠিক রাখার জন্যই শশব্যস্ত থাকতে হয় তবে তিনি প্রতিষ্ঠানকে উন্নতির দিকে নেবার চিন্তাভাবনা করবেন কখন? এতকিছুর পরও যে কোন আর্থিক অনিয়মের জন্য প্রতিষ্ঠাপ্রধানকেই শাস্তি পেতে হয়। অথচ এসএমসি/জিবি-র যে চেয়ারম্যান বা যেসব সদস্য প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ঐসব নিয়মবহির্ভূত কাজ করতে বাধ্য করেন তারা সর্বদাই ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে থাকেন। এমনকি টাকাপয়সা তসরুপাতের ক্ষেত্রেও তারা অনায়াসে পার পেয়ে যান। মাঝখান থেকে ফাঁস পড়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানের গলায়।
এই অবস্থা থেকে পরিত্রান পাবার জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত করবার জন্য এসএমসি/জিবি-র গঠন ও কার্যপরিধিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষক যেমন এখন শিক্ষাকার্যক্রমের ’ফেসিলিটেটর’ তেমনি এসএমসি/জিবি-কে নিয়ন্ত্রক নয় বরং ফেসিলিটেটরের ভুমিকায় আনতে হবে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান এসএমসি/জিবি-র সদস্য-সম্পাদক। তিনি শর্তসাপেক্ষে ’ড্রয়িং ও ডিসবার্সিং অফিসার’ও বটেন। তাকে নিয়মের মধ্যে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বিধিবহির্ভুতভাবে কোন চাপের কাছে তাকে যেন নতিস্বীকার করতে না হয় সেই ব্যবস্থা অবশ্যই সরকারকে করতে হবে। স্কুল-কলেজের ভাল ফলাফল ও অন্যান্য বিষয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধান অবশ্যই জবাবদিহি করবেন। কিন্তু তাকে সর্বদা তার পদ ঠিক রাখার দুর্ভাবনা করতে হলে তাকে দিয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল করার আশা করা যায়না।  রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এসএমসি/জিবি-ও চেয়ারম্যান করা বিধি অবশ্যই বাতিল করতে হবে। ডিসি সাহেবদেরকে যদি এই ’বডি’গুলির চেয়ারম্যান না-ই রাখা যায় তবে উপযুক্ত শিক্ষাগতযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পর্যায়ের লোকের তো দেশে অভাব নেই। তাদেরকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
যাই হোক, উপরে আলোচিত বিষয়গুলিকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে নতুন করে আরো ভালভাবে ভাবনা-চিন্তা করার দরকার আছে। নইলে বর্তমান অবস্থা চলমান থাকলে শিক্ষার মানের দ্রুততর ক্রমাবনতি ঠেকানোর কোন পথ আছে বলে মনে হয় না

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

খাড়াগোদা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গরীব মেধাবী ও এতিম শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ

জাহিদুল ইসলাম মামুন ও আকিমুল ইসলাম: চিত্রা গ্রাম ডাক্তার কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *