সর্বশেষ
Home / সম্পাদকীয় / রাজীবের চলে যাওয়া এবং কঠিন সংগ্রামের গল্প

রাজীবের চলে যাওয়া এবং কঠিন সংগ্রামের গল্প

image-38169কামাল সিদ্দিকী : মারা গেলেন রাজীব! তিনি কি মারা গেলেন না নিহত হলেন এই প্রশ্ন থেকেই গেলো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গত ১৭ তারিখে প্রথমভাগ বারোটার দিকে তার মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করে। বলা হয় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজিব এদিন রাত বারোটা চল্লিশ মিনিটে মারা যান। দু‘বাসের রেষারেষিতে রাজীব তার একটি হাত হারান আবার মাথাতেও প্রচ- আঘাত পান। সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। আরো বলা হয়, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দেশের বাইরে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে জানানো হয়, তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে বিদেশে পাঠানোর মত অবস্থা নেই। তাই তাকে দেশেই উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমে তাকে কেবিনে রাখলেও তার অবস্থার অবনতি ঘটে। ফলে চিকিৎসক টিম তাকেই আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে তার এই দুরাবস্থার সংবাদ পেয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে এসে তার সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করেন।

সরকার থেকে তার চিকিৎসাব্যয় মেটানো হবে বলে তিনি ঘোষণা দেন। আবার সুস্থ হলে তাকে একটি সরকারি চাকুরি দেবার অঙ্গীকার মন্ত্রী করেন। কিন্তু সেই রাজিবকে আর চাকুরি দেওয়ার দরকার নেই। পৃথিবীর সব হিসেব নিকেষ চুকিয়ে তিনি একেবারেই অতীত হয়ে গেছেন। সত্তরের দশকের এক সিনিয়র সাংবাদিক প্রয়াত নির্মল সেন লিখেছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই ‘। তার আক্ষেপ মৃত্যুর বিরুদ্ধে নয় আক্ষেপ অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিরুদ্ধে।

রাজীবের এই চলে যাওয়ার সংবাদ শোনার পর থেকেই আমি রাজীবের বিদেহী আত্মার অভিযোগ শোনার জন্য কান পেতেছিলাম। বিদেহী আত্মা কোন অভিযোগ করেনি। কেবলই জানালো স্রষ্টা আমাকে এভাবেই ধরাধাম থেকে বিদায় নেওয়ার কথা আমার আমলনামায় লিখে রেখেছিলেন। তাই আমাকে এমনি অপঘাতে পৃথিবী নামক সোনার অঙ্গন থেকে জীবনের স্বাদ অপূর্ণ রেখেই ফিরতে হলো।

আমার কিছুই দেখা হলোনা। কেবল মানুষের নিষ্ঠুরতা ছাড়া। সুন্দর পৃথিবীকে আরো বর্ণিল করতে তোমাদের কবিতা গান আজ সবই আমার কাছে মিথ্যা। তোমাদের সভ্যতা তোমাদের মানবিকতা এতেটাই মিথ্যেযে আমাকে অনাহূতের মত চলে যেতে হলো। তবে তোমরা আজো যারা বেঁচে আছো তারা সুখে থাক। সেই কোন ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছি। ছোট দুটি সহোদর ভাই ।

তাদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। তাই সবুজ গ্রাম ছেড়ে রঙ্গীন এবং প্রতিষ্ঠিত জীবনের চাহিদা নিয়েই এই ঢাকা শহরে পা রখি। সুন্দর ভবিষৎ গড়বো এই প্রত্যাশায় ভর্তি হই তিতুমীর কলেজে। যখনই কলেজে যেতাম বা অন্যকোন কাজে যেতাম তখনই কেবলই মা-হারা আমার দুই সহোদরের মূখ ভেসে উঠতো। কেবলই দিন গুণে যেতাম। এই তো আর মাত্র কয়েকটা বছর? লেখাপড়া শেষ করে চাকুরি করবো।

ছোটভাইদের মুখে হাসি ফোটাতে তাদের বায়না পূরন করবো, আরো কত স্বপ্ন আকা ছিলো এই ২১বছরের অপুষ্ট বুকে। মা-বাবকে হারানোর পর খালার কাছে মানুষ। খালাকে বলেছি একটু সবুর করো? আর তো মাত্র কটা দিন? রাজিবের আত্মা আমার কানে কানে এসব ইতিহাস শোনাবার পাশাপাশি বলে গেলো, আমরাতো জন্মেছি মরার জন্য। তাই এমৃত্যুতে আমাদের ততটা বেশি যায় আসে না।কেবলই দুঃখ যাদেরকে আমি ভালো থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম সে কথা রাখতে পারলাম না।

রাজীব হোসেন। দুই সপ্তাহ আগে প্রাণ টগবগে দুচোখে স্বপ্ন জ্বলজ্বল করা রাজীব সদ্যই স্মৃতি হয়ে গেলেন। দুর্ঘটনার পর অনেক অভিমান করে হাসপাতালে একবার বলেছিলেন, ‘রাজীব কে? রাজীব মারা গেছে!’ কার সঙ্গে অভিমান করেছিলেন, তা অজানা রয়ে গেলো। লড়াই করে বড় হয়েছিলেন। এই শহর তাঁর লড়াইকে সম্মান দিয়ে দাঁড়ানোর মতো একচুল জায়গাও দিল না। এখন শেষ আশ্রয়ের জন্য তিনি চলে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে। আর কখনো স্বপ্ন দেখার জন্য তাঁকে ফিরতে হবে না প্রাণহীন ইট-পাথরের শহরে। দুই বাসের চাপায় হাত হারানো রাজীব হোসেনের মরদেহ পটুয়াখালীতে, তাঁর গ্রামের বাড়িতে রচিত হবে তার শেষ শয্যা। তবে তিনি একখানা হাত আমাদের এই ভালোবাসাহীন শহরে রেখে গেলেন। যে হাত কেবলই মানুষের হৃদয়হীনতার কথা যুগে যুগে স্মরণ করিয়ে দেবে।
স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির জন্য ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি তার প্রেমধন্যা স্ত্রীর মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এই আন্দোলন গড়ে তোলেন। সারা বাংলাদেশের সব জেলা শহরে যার শাখা রয়েছে। প্রায়ই এই সংগঠনের পক্ষ থেকে নিরাপদ সড়কের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করা হয়। তারপরেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। আবার নিসচার আন্দোলনও ঘরে ঢুকে চুপচাপ হয়ে যায়নি। তাহলে কেন এই অস্বাভাবিক মৃত্যু?
স্বাভাবিক মৃত্যুর সেই গ্যারান্টি আজো বাংলাদেশের মানুষ পায়নি। বরং সেই গ্যারান্টি এখন চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তারা সরকারের সব আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে কেবলই আইনকে উপহাস করছে। আইনের সকল বিধানকে ধাক্কামেরে নিজস্ব আইনে চলাচলের এমন স্বাধীনতা! বিশ্বে আর কোথাও নেই।তবে মাঝে মাঝে আইনের বাহাস দেখতে পাওয়া যায়। দুর্বৃত্তদের পক্ষে একদল আইনজীবী তাদের পক্ষে শওয়াল করেন।অবশ্য আইনঝীবীদের নিজস্ব একটি যুক্তি আছে। এটি তাদের ব্যবস্যা।

মক্কেলকে খালাস করাই তাদের লক্ষ্য। তাই সত্য মিথ্যা বলে এখানে কিছু নেই। আবার আইন হচ্ছে স্বাক্ষী নির্ভর। যে কোন অপরাধের বিচারের জন্য প্রয়োজন প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীর। আদালতের সামনেও যদি কোন ঘটনা ঘটে আবার তার পক্ষে যদি কোন স্বাক্ষী হাজির করা না যায়, তাহলে সে বিচারের রায় কথিত সাক্ষীর জবানবন্দী মতেই হতে বাধ্য।
৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন (২১)। হাতটি বেরিয়ে ছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎ করেই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করতে বাঁ দিকে গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শমরিতা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাজীবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। সাময়িক উন্নতির পর ১৬ এপ্রিল থেকে তাঁর মস্তিষ্কে‹ রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রাজীবের মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে যায়। আর কোন ভাবেই তিনি জ্ঞান ফিরে পাননি।
রাজীবের ঘটনাটি দেশের মানুষকে নাড়া দিয়ে যায়। রাস্তায় যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ছেলেবেলায় বাবা-মা হারানো রাজীবের বেঁচে থাকার লড়াই, স্বপ্ন সবকিছুর ইতি ঘটেছে। তার উপর নির্ভরশীল দুই ভাইয়ের লেখাপড়া এখন রাহুর কবলে। দুই বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এমন সংগ্রামী তরুণ প্রাণকে থামিয়ে দিয়েছে। মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় রাজীব তার মা আকলিমা খানমকে হারান। সেই শোক বাবা সইতে পারেনি । অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। শোক ভূলতে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। অবশেষে ২০১১ সালে খোঁজ মিললেও চট্টগ্রামের এক আত্মীয়র বাসায় তিনি মারা যান। বাবা মা হারা রাজীবের ছিলো ছোট দুটি ভাই। তারা গ্রামেরবাড়ি বাউফল নানার কাছে ছিলেন।

নিজে জীবন সংগ্রামে লড়তে ঢাকায় এসে পোস্ট অফিস হাইস্কুলে ভর্তি হন। খালার বাড়ি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর রাজীব যাত্রাবাড়ীর মেসে গিয়ে ওঠেন।নিজের পায়ে দাঁড়াতে কম্পিউটার কম্পোজ,গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ শিখছিলেন। ছাত্র পড়াতেন। দম ফেলার ফুরসত পাননি। লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজের পায়ে দাঁড়ানো, ভাই দুটির দায়িত্ব নেওয়া। সেদিন দম ফেলার ফুরসত না পেলেও এদিন ঢাকা মেডিকেলে শেষ দম ফেলে আমাদের বিবেককে আরেকবার চাবুক মেরে জাগিয়ে দিতে চাইলেন।
রাজীবের সব স্বপ্ন এদিন রাতে শেষ হয়ে যায়। প্রায় সাত দিন অচেতন অবস্থায় থেকে একেবারে চলে গেলেন রাজীব।
রাজীবের ছোট দুই ভাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তামিরুল মিল্লাত নামের একটি দাখিল মাদ্রাসায় ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে। আগেই মারা গেছেন মা-বাবা, এবার হারালেন মাথার ওপর একমাত্র ছাদটিকে।
রাজীবের মামলাটি এতোদিন ছিলো আহত করার। এটাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেবার মতো উপাত্ত এখানে জমা ছিলো। কিন্তু সেই ফরিয়াদি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন হয়তো মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেবে। যে দুই চালক সেদিন তাদের কারিশমা দেখাতে নীরিহ এক কলেজ ছাত্রের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে তারা এখন পুলিশের খাচায়। নিয়মিত হত্যা মামলা হলে তারা নিজেদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেবেন। আর সেই আইনজীবী কেবলমাত্র ব্যবসায়িক কারণেই তার মক্কেলকে নির্দোষ বানাতে আদালতে চড়া গলায় মক্কেলের গুনগান গাইবেন।

তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন ঘটনাটি কোনভাবেই ইচ্ছাকৃত নয় বরং এটি একটি এক্সিডেন্ট। আইনজীবীর আইনী যুক্তি এবং ধারায় আদালতকে বোঝাবার চেষ্টা করবেন। আইনের কাছে আদালতের হাতপা বাধা তাই স্বাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত রায় দেবেন। রাজীবের আইনজীবী চড়া গলার কাছে হার মানবেন। আদালতের বাঘা আইনজীবীকে তার পক্ষে নিয়োগ দেওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি রাজিবের পরিবারের নেই। আদালতও সেদিন আইনের কাছে আত্মসর্মপনে বাধ্য হবে।
এসব ঘটেই চলুক আর নিরাপদ থাকুক রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবহন ব্যবসার মাফিয়াতন্ত্র । একে আগলে রাখুক মন্ত্রী ও প্রশাসন। আর আমরা দেখে দেখে বিজ্ঞ হয়ে উঠি। যারা পারি, বিদেশ চলে যাই। যারা পারি, নিজেরাও ওপর তলায় উঠে অন্যদের ঘাড়ে পা দিয়ে প্রতিষ্ঠা অর্জন করি। এবং ভুলে যাই এই তরুণদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কঠিন সংগ্রামের গল্পটা।

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

সময় খুব কম, দেরি করা যাবে না: ড. কামাল

জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবীদের মহাসমাবেশে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন গণফোরামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *