সর্বশেষ
Home / অর্থনীতি / ভ্যাট নিয়ে সব পক্ষ অস্বস্তিতে

ভ্যাট নিয়ে সব পক্ষ অস্বস্তিতে

image-82375‘বিশ্বে উন্নয়নের নতুন মডেল’ হিসেবে দেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আর তাই এবারের বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছেÑ ‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের’। অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেট বক্তৃতাকে সাজানো হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এ বিশাল ব্যয়ের জোগান দিতে করের আওতাও ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের ওপর। ২০১২ সালে প্রণীত ভ্যাট আইন আগামী অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এতে ভ্যাটের আওতা যেমন বাড়ানো হয়েছে, তেমনি বাড়ানো হয়েছে এর হার। ভ্যাট যেভাবে আদায় করার কথা সেই প্রস্তুতিও নেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ীদের। ভ্যাটের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ভ্যাট নিয়ে অস্বস্তিতে ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সরকার।

এটি হবে আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ কার্যকরী বাজেট। বর্তমান সরকারের মেয়াদে আগামী অর্থবছরের বাজেটও দেওয়া হবে; কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য সময় পাবেন ৬ মাসের কম। এজন্য আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেটে থাকছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। ফলে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জনপ্রত্যাশা পূরণ ও নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা থাকবে এ বাজেটে। এটি হবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের ১১তম বাজেট। আর টানা দুই মেয়াদে নবম বাজেট।

রোজার কারণে অধিবেশনের সময় এগিয়ে আনা হয়েছে। আজ দুপুর দেড়টায় অধিবেশন শুরু হবে। শেষ হবে ইফতারের আগেই। অধিবেশন শুরুর আগে জাতীয় সংসদে কেবিনেট কক্ষে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ওই বৈঠকে অনুমোদনের পর উপস্থাপন করা হবে সংসদে। গত কয়েক বছরের মতো সংসদে ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপস্থাপিত হবে বাজেট। এ জন্য কয়েকটি ডিজিটাল স্ক্রিন বসানো হয়েছে।

সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নিজ কক্ষে তার স্যুটে বাজেট বক্তৃতা শুনবেন। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন। গ্যালারিতে বিদেশি কূটনীতিকরাও উপস্থিত থাকবেন।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জনতুষ্টির জন্য যেমন জনকল্যাণকর নানা ধরনের পদক্ষেপ থাকছে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানোর নির্দেশনাও থাকবে। অনেক জনগণকে এক হাতে অর্থমন্ত্রী দেবেন, অন্য হাতে নেবেন। তবে দেওয়ার চেয়ে নেওয়ার প্রবণতাই বেশি বলে জনমনে অস্বস্তি রয়েছে। এদিকে নির্বাচনী বছরে এসে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানোর কারণে সরকারের মধ্যেও স্বস্তি নেই। তারাও দাতাদের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে; কিন্তু করের চাপ যাতে জনগণের ওপর বেশি না পড়ে সেজন্য বাজেটে নানা ধরনের ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় বাড়ানো, দরিদ্রদের জন্য বিশেষ তহবিল, অনুন্নত এলাকার জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ, রপ্তানি খাতে নানা ধরনের প্রণোদনা, নারী উদ্যোক্তাদের সুবিধা বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা, ক্ষুদ্র ও ছোট পুঁজির ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের বাইরে রাখার বিধান হচ্ছে।

অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত থাকবে, ভ্যাটের আওতা ও হার বাড়ছে। আগামী অর্থবছর থেকে ছোট ব্যবসায়ীদের টার্নওভারের ওপর ৩ শতাংশ ও বড় ব্যবসায়ীদের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। ভোক্তাদের কাছ থেকে ভ্যাটের অর্থ আদায় করে তারা সরকারের কোষাগারে জমা দেবে। এতে জনগণের ওপর ভ্যাটের বোঝা বাড়বে। বাড়বে পণ্য ও সেবার মূল্য। ব্যাংকিং খাতে আবগারি কর বাড়বে। ফলে ব্যাংকের গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ছাড়া প্রায় সব খাতে উৎসে আয়কর বাড়ছে। এই হার করা হচ্ছে ৫ শতাংশ। এবার প্রথমবারের মতো উৎসে ভ্যাট আরোপ হচ্ছে। ৫ শতাংশ হারে তা কেটে রাখা হবে।

এবারের বাজেট এমন সময় ঘোষণা হচ্ছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা, অভ্যন্তরীণ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি, রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা, বিনিয়োগে মন্দা বিরাজ করছে। বাজেটে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার কথাও তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ বাড়ানো। গত কয়েক বছর এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার পরও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাড়ছে না কর্মসংস্থানের হারও।

এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন ভ্যাট আইন। আইনটি নিয়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি খোদ সরকারের মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে। নতুন ভ্যাট আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ হলে নতুন করে পণ্যমূল্য নির্ধারণের প্রয়োজন পড়বে। বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান শুরু থেকে বিভিন্ন স্তরে যে ভ্যাট পরিশোধ করবে, চূড়ান্ত ভোক্তা ওই পণ্যের ভ্যাট দেওয়ার পর উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আগে দেওয়া ভ্যাটে রেয়াত পাবেন। তবে এক্ষেত্রে সঠিকভাবে হিসাবরক্ষণ ও জটিল রেয়াত প্রক্রিয়া কতটা ভোক্তাবান্ধব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারতুষ্টির কথা মাথায় রেখে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ভ্যাট অব্যাহতির সীমা বাড়ানো হচ্ছে, ভ্যাট আদায়ের পর বিভিন্ন খাতে রিবেট দেওয়া হবে, ভ্যাট দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের বার্ষিক টার্নওভারের সীমাও বাড়ানোর ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী।

নতুন আইনে ভ্যাট অব্যাহতির সীমা রয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এটিকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ টাকা করা হচ্ছে। ফলে ৩৬ লাখ টাকা পুঁজির ব্যবসায়ীদের কোনো ভ্যাট দিতে হবে না। এর আওতায় পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পুঁজির বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র উৎপাদক, বিপণনকারী। এনবিআর মনে করে এর ফলে ভ্যাটের প্রভাবে ক্ষুদ্র পুঁজির কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

বর্তমানে ব্যবসায়ীদের বার্ষিক টার্নওভারের পরিমাণ ৮০ লাখ টাকা হলে তাকে ৩ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। আগামী বাজেটে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এ পরিমাণ টার্নওভারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ছাড় পাচ্ছে। ফলে এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ভ্যাটের আওতা থেকে ছাড় পাবেন। এসব প্রতিষ্ঠনে ভ্যাটের চাপ কিছুটা কমবে। ফলে এগুলোয় পণ্যের দামও বাড়বে না। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকজন বেশি কেনাকাটা করেন। ফলে ভ্যাটের চাপ তাদের ওপরও পড়বে না বলে মনে করে এনবিআর।

এ ছাড়া ভ্যাট আইনে এবার বড় ধরনের রেয়াতি সুবিধা রাখা হচ্ছে। ভ্যাটের নিয়ম হচ্ছেÑ যে হারে আরোপ করা হবে সেই হারেই আদায় করতে হবে। এর বেশি আদায় করা যাবে না। যে কারণে বর্তমানে যেখানে যত মূল্য সংযোজন হচ্ছে সেখানে ওই মূল্য সংযোজনের ওপর ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। নতুন আইনে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সব খাতেই ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা যেখানে যত ভ্যাট দিচ্ছেন তার হিসাব রাখতে হবে। বছর শেষে গড় হিসাবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রেখে বাকি টাকা ব্যবসায়ীদের ফেরত দেওয়া হবে। তবে বিপুলসংখ্যক পণ্য ও সেবায় ভ্যাট ছাড় দিয়ে ব্যবসায়ীদের খুশি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে ২০০’র বেশি পণ্য ও সেবা ভ্যাটমুক্ত থাকছে। এর ফলে নতুন আইনে বিদ্যমান প্রায় ১ হাজার ৯শ ভ্যাটমুক্ত পণ্য তালিকার সঙ্গে আরও দুইশ পণ্য ও সেবা যোগ হচ্ছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ শিল্পের সুরক্ষায় বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কের তালিকাও বহাল থাকছে। তাই নতুন ভ্যাট আইনে ১৭০টি পণ্য ও সেবায় সম্পূরক শুল্ক থাকার কথা। এর পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কের তালিকার ১ হাজার ৪শ পণ্য ও সেবার ওপরেই সম্পূরক শুল্ক রাখা হচ্ছে।

অন্যদিকে ভ্যাট আইন ছাড়াও আগামী বাজেটে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা এবং জনতুষ্টির জন্য নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া। এজন্য আগামী অর্থবছর ভোটারসন্তুষ্টির চেষ্টার সঙ্গে বড় দৃশ্যমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হচ্ছে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আসবে দুই লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। মোট রাজস্বে চালকের আসনে উঠে এসেছে মূল্য সংযোজন কর (মূসক)। আগামী অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আর আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকা। আমদানি পর্যায়ে শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা।

আগামী বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ দশমিক ০৪ শতাংশ। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

IMG_2051

কেসিসি মেয়র এর সাথে এনইউবিটি খুলনার শব্দ দূষন ও প্রতিকার বিষয় সেমিনার

নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি খুলনাতে অবস্থিত আমেরিকান কর্ণার খুলনার এনভায়রনমেন্ট ক্লাব এর উদ্যোগে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *