সর্বশেষ
Home / লাইফ স্টাইল / দামুড়হুদায় বিলুপ্তির পথে বাঁশ শিল্প: হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য

দামুড়হুদায় বিলুপ্তির পথে বাঁশ শিল্প: হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য

Darsana Picture (Bash Shilpo)-04.02.2018দর্শনা থেকে আব্দুর রহমান ঃ  প্লাষ্টিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব, শ্রমিকের মজুরিসহ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় দামুড়হুদার বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। ফলে এ পেশার সাথে জড়িত অনেকেই এখন চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। বিগত কয়েক বছর ধরে বাঁশ শিল্পে বিরাজ করছে চরম মন্দাবস্থা। ফলে এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল লোকজন বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই আবার এ পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। বাঁশ শিল্প বাঙালী জাতির সংস্কৃতির একটি অংশ। তাই এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পৃষ্টপোষকতাসহ বাঁশ চাষে জনগনকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশি¬ষ্টরা।

দামুড়হুদা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, এক সময়ের আবহমান গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য শিল্প ছিল বাঁশ শিল্প। ফলে এ শিল্পকে কেন্দ্র করে দামুড়হুদায় গড়ে ওঠে কুটির শিল্প। আর এ শিল্পের সাথে এখনও জড়িত রয়েছে উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ। দামুড়হুদা উপজেলার  কালিদাস পুর, কার্পাসডাঙ্গা, জয়রামপুর, রামনগর, লোকনাথপুর, গোপালপুর, কুড়ালগাছি, জগন্নাথপুর ও মদনাসহ বেশ ক’য়েকটি গ্রামের ঋষি স¤প্রদায়ের লোকেরা  এ পেশার সাথে জড়িত রয়েছে।

এক সময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ  স¤প্রদায়ের লোকেরা রাস্তার ধারে ও বাড়ির আঙ্গিনায় বসে বাঁশের চটা দিয়ে চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙ্গারি, ঢালন, মাছ রাখা খালই, ঝুড়ি, মোড়া, ঝাঁকা, মুরগির খাঁচা, চালনসহ  বিভিন্ন জিনিষপত্র তৈরীর কাজ করতো। গৃহবধূরাও রান্না-বান্না ও ঘরের কাজ শেষে এসব জিনিস তৈরী করতো। তাদের তৈরী এসব জিনিষপত্র গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ও এলাকার বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও সরবরাহ করা হতো।

দর্শনা পৌর এলাকার  বাসিন্দা মোহন দাস ও  কালিদাস পুর গ্রামের মদন দাস জানান, এক সময় গ্রামগঞ্জের ঘরে ঘরে বাঁশের তৈরী এসব সামগ্রীর খুবই কদর ছিল। এখন সে স্থান দখল করে নিয়েছে সস্তা দরের প¬াষ্টিকের তৈরি নানা রঙের জিনিষপত্র। ফলে বাঁশের তৈরি জিনিষপত্র তেমন আর বিক্রি হয়না। তবে এখনও অনেক শৌখিন মানুষ আছে যার আমাদের তৈরি এসব জিনিষ কিনতে চায়। তবে দাম বেশি হওয়ার কারনে অনেকেই পিছিয়ে যায়। এ কাজে আগের মত আর লাভ হয় না। তবুও খেয়ে না খেয়ে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি বাপ-দাদার এ পেশা ধরে রেখেছি।

আগে গ্রামের প্রতিটি পরিবারেরই নিজস্ব বাঁশঝাড় ছিল। বাড়ির পার্শ্বের পতিত জমিতে বাঁশের ঝাড় ছিল। তাতে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও বছরে অনেক টাকার বাঁশ বিক্রি করতো। তখন বাঁশের দামও ছিল কম। বর্তমানে  এলাকায় বাশঁঝাড় কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে অনেক। তাই বাঁশের মূল্য ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাঁশের তৈরি এসব জিনিষপত্র বিক্রি করে লাভ কম হওয়ায় এ শিল্পে আগ্রহ হারাচ্ছে মানুষ।

এক সময় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্রের ব্যবহার ছিল। বর্তমান প¬াষ্টিকের তৈরি জিনিসপত্র এসব পণ্যের স্থান দখল করে নিয়েছে। দামও কম।  ফলে প¬াষ্টিকের তৈরি এসব জিনিসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ কুটির শিল্পটি। ক্রেতার  অভাব আর এ শিল্পের মুল উপকরণ বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারনে কুটির শিল্পীরা তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারপরও অনেকেই নিরুপায় হয়েই বাপ-দাদার এ পেশা টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছর নানা কাজে ব্যবহারের জন্য হাজার হাজার বাঁশ কাটা হচ্ছে।

কিন্তু সেই তুলনায় বাঁশ লাগানো হচ্ছে অনেক কম। ৩/৪ বছর আগেও মাঝারী ধরনের একটি বাঁশের মুল্য ছিল ৭০থেকে ৮০ টাকা। বর্তমানে সে ধরনের একটি বাঁশ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। কিন্তু সে অনুপাতে বাঁশের তৈরী এসব পন্যের মূল্য বাড়েনি। ২ দশক আগেও উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই বড় বড় বাঁশের ঝাড় দেখা যেত। বর্তমানে বাঁশঝাড়  তেমন আর চোখে পড়ে না।

সচেতন মহল মনে করেন, আবহমান গ্রাবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এ বাঁশ শিল্পকে ধ্বংশের হাত থেকে রক্ষা করা দরকার। তাই এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে  ও দৈনন্দিন কাজে বাঁশের চাহিদা মেটাতে বাঁশ আবাদে জনগনকে উৎসাহিত করতে সরকারের পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন।

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

সময় খুব কম, দেরি করা যাবে না: ড. কামাল

জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবীদের মহাসমাবেশে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন গণফোরামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *