সর্বশেষ
Home / পরিবেশ ও জলবায়ু / দর্শনা কেরু এন্ড কোম্পানির বর্জ্যরে দুর্গন্ধ বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই ছড়িয়ে মারাত্মক পরিবেশদূষণ; স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এলাকাবাসী

দর্শনা কেরু এন্ড কোম্পানির বর্জ্যরে দুর্গন্ধ বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই ছড়িয়ে মারাত্মক পরিবেশদূষণ; স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এলাকাবাসী

Darsana Picture (4)দর্শনা থেকে নুরুল আলম বাকু: পরিবেশ রক্ষায় সরকার যখন দেশের শত শত ইটভাটাসহ বিভিন্ন কলকারখানায় জ্বালানি ব্যবহারের উপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন, দূষণমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে নিত্যনতুন গবেষণা চালিয়ে বিভিন্ন প্লান্ট, যানবাহন, কারখানা, ফার্নেস ইত্যাদির নতুন নতুন নকশা তৈরিতে ব্যস্ত ঠিক সেই মূহুর্তে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় দেশের রাস্ট্রায়ত্ব সর্ববৃহৎ চিনিকল ও ডিষ্টিলারি কেরু এন্ড কোম্পানির বর্জ্যরে দুর্গন্ধ, বয়লারের চিমনি থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে মিশে মিলের চার পাশের ৪/৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দুষণ ঘটছে।

মারাত্মক  স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে চিনিকলের আশপাশ এলাকার হাজার হাজার মানুষ। একটি রাষ্ট্রাায়ত্ব প্রতিষ্ঠানের কারনে বছরের পর বছর এলাকায় মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণের ঘটনা ঘটে চললেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দুষণরোধে কোন ব্যাবস্থা না নেয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। দীর্ঘদিন থেকে এ অবস্থা চলতে থাকলেও যেন দেখার কেউ নেই। পরিবেশ দুষণরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

জানা যায়, ইংরেজি ১৯৩৮সালে চুয়ডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী জনপদ দর্শনায় এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও দেশের সর্ববৃহৎ চিনিকল স্থাপিত হয়। সেইসাথে চিনিকলের উপজাত চিটাগুড় ব্যবহার করে বাংলামদ, বিলাতিমদ, রেক্টিফাইড ও ডিনেচার্ড স্পিরিট, মল্টেড ভিনেগার উৎপাদন করতে ডিষ্টিলারি ও ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত বেশ কয়েক প্রকার মাদার টিংচার উৎপাদনের জন্য ফার্মাসিটিক্যাল স্থাপন করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনকালে পুরো এলাকাটি ছিল ফাঁকা মাঠ। আর আশপাশের গ্রামগুলোতেও জনবসতি ছিল খুবই কম। তবুও ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এলাকায় বসবাসকারীদের স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে চিনিকলের বয়লারের ধোঁয়া নির্গমনের জন্য ১৫০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনি ও মিলের তরল বর্জ্য ও যন্ত্রপাতি ধোয়া-মোছাসহ আবাসিক এলাকার নানা কাজে ব্যবহৃত নোংরা পানি নিষ্কাশনের জন্য চিনিকল থেকে মাথাভাঙ্গা নদী পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাইপলাইন বসিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে উৎপাদন শুরু করে।

Darsana Picture (2)মিলটি স্থাপনের পর উৎপাদন শুরুর প্রথম থেকেই বয়লারের জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হতো কয়লা ও ভাল মানের জ্বালানি কাঠ। আর দীর্ঘ উচ্চতাসম্পন্ন চিমনি দিয়ে বয়লারের নির্গত ধোঁয়া সহজেই বাতাসে মিশে অনেক উপর দিয়ে দুরে চলে যেত। তাতে বায়ুদুষনের মাত্রা ছিল সহনীয় পর্যায়ে। সেই থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এলাকার মানুষের তেমন একটা অসুবিধা ছিল না। কালক্রমে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে চিনিকলের আশপাশের ফাঁকা জায়গায় জনবসতি গড়ে উঠে বর্তমানে পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোর সাথে সংযুক্ত হয়ে পুরো এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ন লোকালয়ে পরিনত হয়েছে।

অপরদিকে বিভিন্ন সময়ে অজ্ঞাত কারনে চিনিকলের বয়লারের চিমনির উচ্চতা কমেছে প্রায় ৩০-৩৫ফুট। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কয়লার সরবরাহ কমে যাওয়ায় বয়লারের জ্বালানি হিসাবে নি¤œমানের কাঠ ও আখের ব্যাগাস ব্যাবহার শুরু হয়। এছাড়াও চিনি কারখানার বড় চিমনির পাশে স্বল্প উচ্চতার আরেকটি ছোট চিমনি ও ডিষ্টিলারিতে আরোও দুইটি স্বল্প উচ্চতার চিমনি রয়েছে। মিলে উৎপাদন চলাকালে এ সমস্ত চিমনি দিয়ে অনবরত নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া  ছাই বাতাসে ছড়িয়ে মারাত্মকভাবে পরিবেশদূষণ ঘটছে।

অতি সম্প্রতি মিলের যন্ত্রপাতির আধুনিকায়নে নুতন বয়লার স্থাপন করা হয়েছে এবং সেইসাথে জ্বালানির তালিকায় কাঠ, ব্যাগাসের সঙ্গে নুতন করে যোগ হয়েছে ফার্নেস অয়েল। তাতে একদিকে চিমনির স্বল্প উচ্চতা অপর দিকে অপরিকল্পিতভাবে নি¤œমানের জ্বালানি ব্যবহারের ফলে চিমনি থেকে নির্গত মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ছাই, বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত কালো ধোঁয়া এলাকার পরিবেশদুষণে যোগ হয়েছে নুতন মাত্রা। সেইসাথে জ্বালানি হিসাবে প্রতিবছর নানা প্রজাতির হাজার হাজার মন কাঠ পোড়ানোর ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের মত ঘটনাটি ত্বরান্বিত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের সময় কারখানার তরল বর্জ্য ও যন্ত্রপাতি ধোয়া-মোছাসহ আবাসিক এলাকার নানা কাজে ব্যবহৃত নোংরা পানি নিষ্কাশনের জন্য চিনিকল থেকে মাথাভাঙ্গা নদী পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাইপ লাইন বসানো হয়। এ পাইপ লাইনটি দীর্ঘদিনের পুরাতন হওয়ায় প্রায় এক যুগ ধরে পাইপের বিভিন্ন অংশ ফেটে ও ভেঙ্গে গিয়ে মিলের তরল বর্জ্যসহ নোংরা পানি বের হয়ে রেলবাজার সংলগ্ন বদের মা’র গর্ত, দক্ষিন দিকের আশুর গর্র্ত, মোছাদ্দারুল মিয়ার পুকুর ভর্তি হয়ে ও পুরাতন বাজার হিন্দু পাড়ার রাস্তাসহ বসতবাড়ির উঠানে ভর্তি হয়ে গোটা এলাকায় মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে।

এতে এলাকার ভুক্তভোগীরা পৌরসভা ও কেরু কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে নোংরা পানির দুর্গন্ধ দুর করতে এতে চুন ও ব্লিচিং পাওডার ছিটিয়ে দায়সারা গোছের কাজ করতে থাকে। এ অবস্থা প্রকট আকার ধারন করলে অবশেষে কয়েক বছর আগে কেরু চিনিকল কর্তৃপক্ষ টেন্ডারের মাধ্যমে পাইপ লাইনটির কিছু অংশ  মেরামত করে। এ সময় চিনিকলের সংশিষ্টদের দুর্নীতি ও অবহেলা সেইসাথে নির্মানকাজে নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহারের ফলে সংস্কারের কিছুদিনের মাথায় আবারো লাইনের বিভিন্ন স্থানে ফাঁটল ধরে আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে অসহনীয় দুর্গন্ধে দর্শনা শহরসহ পুরো এলাকাবাসীকে অতিষ্ট করে তোলে।

তারই ধারাবাহিকতায় চলতি মাড়াই মৌসুম শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় রেল লাইনের পাশে পাইপ ফেটে বের হওয়া বিষাক্ত, দুর্গন্ধময় ও নোংরা পানিতে ৩টি পুকুর ভরে যায় এবং আশপাশের প্রায় ২০টি বাড়ি প্লাবিত হয়। এর ফলে ওই সমস্ত বাড়িঘরে বসবাসকারি বেশ কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকেন। পুকুর বিষাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়ে অর্ধ লক্ষাধিক টাকার মাছ মরে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হন পুকুর মালিকরা। ভুক্তভোগীদের অনেকেই জানান, মিলের চলতি মাড়াই মৌসুম শুরুর কয়েকদিন আগে পাইপ লাইনের বেশ কিছু ভাঙ্গা অংশে টিন ও সিমেন্ট দিয়ে দায়সারাগোছের মেরামত কাজ করে। মিলের মাড়াই কার্যক্রম শুরু হলে নির্গত বর্জ্য পানির পরিমান বেড়ে যাওয়ায় মেরামতকৃত জায়গা ভেঙ্গে গিয়ে পানি বের হতে থাকে।

খবর পেয়ে মিলের লোকজন এসে শ্যালো মেশিন দিয়ে পাম্প করে এ দূর্গন্ধময় পানি নিষ্কাশন শুরু করে কয়েকদিন ধরে পানি ছেঁকে ফেঁটে যাওয়া পাইপ কোনরকমে মেরামত করে। পাইপ দিয়ে নতুন করে পানি বের হওয়া বন্ধ হলেও আশপাশের পুকুর ও গর্তে আগের বের হওয়া পানি জমে আছে। সম্প্রতি রেলবাজার সংলগ্ন কেরু বাজার মাঠের পাশের পাইপ ফেটে বর্জ্যপানি বের হয়ে এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দিনের বেলা যত রোদ পড়ে এসব স্থানের পানি শুকিয়ে দুর্গন্ধের মাত্রা তত বাড়তে থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী, স্থানীয় ব্যাবসায়ী ও পথচারীরা পড়েছে চরম বিপাকে। অনেকের অভিযোগ, পাইপলাইন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পাইপের মধ্যে ময়লা জমে থাকায় পানি বাধাগ্রস্থ  হয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। পাইপ পরিষ্কারের কাজ নিয়মিত তদারক করলে এ অবস্থা হতো না। তারা আরোও বলেন, জমে থাকা দুর্গন্ধময় এ নোংরা পানি দ্রুত নিস্কাশন করা প্রয়োজন। নতুবা এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে এলাকায় মারাত্মকভাবে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

এছাড়াও কয়েক বছর আগে চিনিকল ক্যাম্পাসে অপরিকল্পিতভাবে বড় আকারের ২টি খোলা ট্যাঙ্ক নির্মান করে সেখানে জৈব সার তৈরির কাঁচামাল চিনি কারখানার দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য রাখা হচ্ছে। খোলা অবস্থায় থাকার কারনে এ বর্জ্যের দুর্গন্ধে রাতদিন এলাকার বাতাস ভারি হয়ে থাকে। দিনের বেলা যত রোদ পড়ে এর পানি শুকিয়ে দুর্গন্ধের মাত্রা তত বাড়তে থাকে। যা এলাকার সাধারন মানুষের জন্য রীতিমত অসহনীয়। এ দুর্গন্ধের কারনে কেরু আবাসিক এলাকা ছাড়াও পৌর শহরের আনোয়ারপুর, শান্তিপাড়া, পাঠানপাড়া, মোবারকপাড়া, ইসলামবাজার, পুনাতনবাজার, মহম্মদপুর, আজমপুর মহল্লাসহ গোটা শহর জুড়ে মারাত্মকভাবে বায়ু দুষন ঘটছে। ফলে বায়ু দুষনজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকায় বসবাসকারী মানুষ। বিভিন্ন সময়ে এ ব্যাপারে পৌরসভা ও কেরু চিনিকল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোন ফল হয়নি বলে আভিযোগ অনেকের।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উজ্জল পরমায়ুর মূলমন্ত্র নির্মল বায়ু। বর্তমানে নানা কারনে পরিবেশ দূষনের ফলে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বিশুদ্ধ, ¯িœগ্ধ, মুক্ত বাতাস প্রায় অনুপস্থিত। বিভিন্ন কারখানার বয়লারের চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় কার্বনডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, অতি সুক্ষ কার্বনকণা, নানা ধরনের বিষাক্ত গ্যাসসহ মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর নানা রাসায়নিক পদার্থ। যা অনবরত মানবদেহে প্রবেশের ফলে ব্রঙ্কাইটিস, কাশি, হাপানি, যক্ষাসহ শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ, হার্টের সমস্যা এমনকি ক্যান্সারের মত মারত্মক রোগেও আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে।

ফরিদপুর ম্যাট্স এর ভাইস প্রিন্সিপাল ডাঃ মেজবাউল হক বলেন, বিভিন্ন কল-কারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের সাথে মিশে বায়ুদূষণ ঘটায়। দুষিত বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাসসহ নানাভাবে অনবরত মানুষের শরীরে প্রবেশের ফলে ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, কাশি, হাপানি, যক্ষাসহ শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগসহ হার্টেরও সমস্যা হয়। এমন কি এসমস্ত বিষাক্ত ধোঁয়া ও সূক্ষ কার্বনকণা শরীরে প্রবেশের ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি হলে ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগও হতে পারে।

দর্শনা পৌরসভার মেয়র মতিয়ার রহমান দর্শনাবাসীর এ ভোগান্তির কথা স্বীকার করে বলেন, আমার বাড়ীর ছাদেও প্রতিদিন ছাই জমে থাকে। বর্তমানে মিলের কারনে পরিবশেদূষণ হচ্ছে। এর অবসান হওয়া দরকার।

এ ব্যাপারে কেরু এন্ড কোম্পানির ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এনায়েত হোসেন বলেন, ইতোমধ্যেই আমরা এ অবস্থা নিরসনে ব্যাবস্থা নিয়েছি। নুতন বয়লার নির্মানের কাজ চলছে। এর নির্মানকাজ শেষ হলে ছাই ও ধোঁয়ার পরিমান কমবে। আর পাইপলাইন মেরামতের জন্য আমরা বাজেট করেছি। আশা করি শীঘ্রই এ অবস্থা নিরসন হবে।

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

সময় খুব কম, দেরি করা যাবে না: ড. কামাল

জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবীদের মহাসমাবেশে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন গণফোরামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *