সর্বশেষ
Home / অর্থনীতি / খেলাপি ঋণ আদায়ে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

খেলাপি ঋণ আদায়ে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

585ডেস্ক রিপোর্ট: সরকারি ব্যাংকগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে অসমর্থ হওয়ায় ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়ছে ক্রমেই। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহল ব্যাংক ঋণ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। ব্যাংক খাতে আদায় হবে না এমন মন্দ ঋণের হার বাড়ছেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে ৫০ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকার ঋণ আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা ২০১৫ সাল শেষে ছিল ৪৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। অর্থাত্ চলতি বছরে নতুন করে ৭ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা ঋণ আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ২০১৫ সালে আদায় অযোগ্য ঋণ ২০১৪ সালের তুলনায় ৪ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা বেড়েছিল।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক সুবিধায় ঋণ পুনর্গঠন ও বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমছে না। প্রতিনিয়ত খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণের কারণে এটি হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দুর্নীতিও রয়েছে। ব্যাংকাররা যেমন দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ দিয়েছেন, তেমনি প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ম মাফিক পরীক্ষা না করেও ঋণ দিয়েছেন। ফলে আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদায় অযোগ্য ঋণের অর্ধেকের বেশি সরকারি মালিকানাধীন ৮ ব্যাংকের। এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ১৯ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর ১ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা ঋণ আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিষয়টি সবাইকে বিব্রত করে, এ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন মহলে এবং ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দারুণ অস্বস্তি রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়াটা ব্যাংক খাতের জন্য অশনি সংকেত। যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেওয়ার কারণে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। সুদের হার ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সব থেকে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। কম পুঁজির এসব ব্যবসায়ীর অনেকে অর্থ অভাবে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। ফলে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকাও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না। যার প্রভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।

ঋণ আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণেরও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকের আয়ও কমে যাচ্ছে। তবে পরিচালন ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়া, বিদ্যুত্ বিলসহ বিভিন্ন খরচ বাড়ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের সরাসরি মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ খেলাপি ঋণের শ্রেণি ভেদে ব্যাংকগুলোর ২৫ শতাংশ থেকে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। এ প্রভিশন রাখতে হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। এ ছাড়া মন্দ ঋণের বিপরীতে অর্জিত সুদ ব্যাংকগুলো আয় হিসেবে দেখাতে পারে না। এ সুদ স্থগিত করে রাখা হয়।

বিগত কয়েক বছর ধরে ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলসহ নানামুখী সুবিধা পেয়েছেন বড় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সুবিধা নেওয়া ব্যবসায়ীরা ঋণের টাকা সময়মতো ফেরত দিচ্ছেন না। অথচ যেসব ছোট ব্যবসায়ী পুনর্গঠন ও ঋণ পুনঃতফসিল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই ঋণের টাকা পরিশোধে এগিয়ে রয়েছেন।

অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া ঋণ আদায় করতে না পেরে মূলধন শূন্য হয়ে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি ৯ ব্যাংক। গত সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হয়েছে ১৬ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাতের ব্যাংক সাতটি ও বেসরকারি খাতের দুটি। চলতি বছর থেকে ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে ১০ শতাংশ ন্যূনতম মূলধনের পাশাপাশি দশমিক ৬২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। গত সেপ্টেম্বর শেষে ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ৯ ব্যাংক। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকে ঘাটতি ২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১১২ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ৭৭১ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ৩০৩ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৭২৬ কোটি টাকা।

সমৃদ্ধির নানা সোপান অতিক্রম করে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। নানা অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের অভিশাপ বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আমাদের ব্যাংকিং খাত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না খেলাপি ঋণের কারণে। হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাঁধে চেপে  থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার পরও তাদের সেই সাফল্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

প্রিন্ট

About এডমিন

Check Also

ভোটারহীন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থার কবর রচিত হয়েছে: পীর সাহেব চরমোনাই

ইসলামী অন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) বলেন, ভোটার ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *